গতকালের ৩২তম বাৎসরিক মতুয়া ধর্ম সম্মেলনে
মতুয়াদের উপচে পড়া জনস্রোতে একটি যুগান্তকারী, বর্ণময় জমজমাট অনুষ্ঠান হয়ে গেল।
যুগান্তকারী এই কারণে যে, মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি শ্রী শান্তনু ঠাকুর অনুষ্ঠান মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগণিত মতুয়া ভক্তবৃন্দের সম্মুখে ঘোষণা করলেন যে, তিনি নিজে রাজনীতি করবেন না, বরং মতুয়াদের দিয়ে রাজনীতি করাবেন, এবং পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বুকে মতুয়া রাজনৈতিক শক্তিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।
এবং সেইসঙ্গে সংসদের এই শীতকালীন অধিবেশনে যাতে উদ্বাস্তুদের নাগরিকতা নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় সরকার আইন পাশ করে তার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন এ কথাও বলেন।ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা গোপালনগর ও স্বর্ণখালির মতুয়া সম্মেলনে এসে সেরকমই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মতুয়া আন্দোলনের ইতিহাসে একটা স্মরণীয় দিন।
মতুয়াদের উপচে পড়া ভিড় ও সক্রিয় উপস্থিতি বলে দিচ্ছিল যে, মতুয়ারা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে, তারা যেন নতুন কিছু করতে চায়, নতুন ইতিহাস তৈরির জন্য যেন তারা প্রস্তুত। বাইরের কোন প্রলোভন দ্বারা চালিত হয়ে নয়,বা অন্য কোন শক্তির প্ররোচনা দ্বারা নয়; তারা যে ভিতরের নিজস্ব তাগিদ থেকে, আপন চেতনা দ্বারা চালিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছে নিজেদের আপন সঙ্ঘশক্তিকে সংগঠিত করার জন্যে তা তাদের শরীরের ভাষাতেই প্রকাশ। এই স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ নতুন সম্ভাবনার দিকে ইশারা করছে। এই ঐক্য ও জাগরণ যে অতি দ্রুত আরো প্রসারলাভ করবে, এর তরঙ্গ যে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে দেশব্যাপী তাও অনুধাবন করা যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ৯ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৩ কোটি মানুষ মতুয়া।এরা যদি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত হতে পারে তাহলে বাংলা তথা সারা ভারতের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটে যাবে।নেতৃত্বের সচেতন তৎপরতা তাকে আরো নিকটবর্তী করে তুলতে পারে।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে মতুয়া মহাসঙ্ঘ তথা মতুয়াদের প্রধান দাবী, সংসদের এই শীতকালীন অধিবেশনে উদ্বাস্তুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মানবিক কারণে এই দাবি সঙ্গত, রাজনৈতিক কারণেও। কারণ, এরা অভিশপ্ত দেশভাগের বলি।দেশভাগটা না হয়েছে সুষ্ঠু, সঠিক ও সুচিন্তিতভাবে, না দেশভাগের ফলে ভুক্তভোগী মানুষের কথা সঠিকভাবে ভাবা হয়েছে।ফলে তারা আজ সঙ্কটে।এই সঙ্কট অবশ্যই একটা মানবিক সঙ্কট।তাই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই সরকারের এটা দেখা উচিত।যদি তা না দেখা হয়,তাহলে তা ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কের অধ্যায়ের সূচনা করবে।
এদেশটা ভাগ হয়েছিল একমাত্র মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের দাবির ভিত্তিতে, অন্য কোন গোষ্ঠী এরকম দাবি করেনি।মুসলমানদেরকে তাদের দাবি অনুযায়ী আলাদা রাষ্ট্র দেওয়া হয়েছে।কিন্তু মুসলমানদেরকে আলাদা রাষ্ট্র দিতে গিয়ে যারা রাষ্ট্রহীন হয়েছে,উদ্বাস্তু হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,তাদের কথা ভাবা, তাদের সমস্যা সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।এই দায়িত্ব রাষ্ট্র কোনভাবেই এড়াতে পারে না। অবান্তর ছুতো বা অজুহাত দেখিয়ে এই মানুষগুলোকে অথৈ জলে ফেলে দেওয়া,বা এই দাবিকে অস্বীকার করা বা এই দাবির বিরোধিতা করা অমানবিকই শুধু নয়,তা আসলে দেশমাতৃকার অন্তরে ছুরিকাঘাত করার সামিল।
নাগরিকত্বের দাবি ন্যায্য দাবি।এই দাবি মানতেই হবে।
শরণার্থীর মর্যাদা নয়,মতুয়ারা চায় নাগরিকত্বের মর্যাদা।

